ইতিহাসের পাতা থেকে
সূচনা
ইতিহাসের বহু ঘটনা আজও আমাদের কাছে অজানা রয়েছে। সেরকমই আমাদের এই বাংলায় দুর্গা পূজার ইতিহাসও অতি প্রাচীন, গল্পকথা থেকে শোনা যায় যে মহারাজা নবকৃষ্ণদেব আমাদের বাংলায় দুর্গা পূজার প্রত্যাবর্তন করেন। এছাড়া কলকাতার প্রাচীন পূজা যেমন সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বাড়ির দুর্গা পূজা অথবা শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গা পূজার সাথে যেমন অনেক ইতিহাস জড়িয়ে ঠিক তেমনই গিরিশ পার্ক চত্তরের নবদুর্গার ইতিহাসের গল্প আজ জানা যাক।
ইতিহাসের প্রস্তুতিপর্ব
স্বাধীনতার প্রাক্কালে ব্রিটিশাধীন ভারতে কলকাতার প্রাণকেন্দ্র উত্তর কলকাতার গিরিশ পার্ক অঞ্চলে অন্যান্য দুর্গা পূজাগুলির থেকে কিছুটা ভিন্ন ধরনের প্রতিমা দ্বারা এক দুর্গাপূজার শুভারম্ভ হয়।
সালটা ১৯৩২, ব্রিটিশ শাষণে বাংলা তথা ভারতের মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত, ঠিক সেই সময় উত্তর কলকাতার জেলিয়াটোলা অঞ্চলে আশ্বিন মাসের দুর্গা তিথিতে শুরু হয় নবদুর্গার আরাধনা।
ইতিহাসের বাস্তবায়ন
তথাকথিত অঞ্চলের এক শিক্ষিত ব্রাহ্মন স্বর্গীয় শ্রী হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য মহাশয় স্বপ্নাদেশ পান দেবী দশভূজার। স্বপ্নাদেশে আদিশক্তি হেমচন্দ্রবাবুকে আদেশ করেন সাধারন দুর্গা প্রতিমার থেকে ভিন্ন, জনসাধারনের অজানা দেবী দুর্গার নয়টি রূপের আরাধনা করার। স্বপ্নাদেশ প্রদত্ত আদেশ অনুসারণ করে নিজ বাসগৃহের ঠাকুর ঘরে নয়টি ছোটো ছোটো পুতুলাকৃতির প্রতিমা নিয়ে শুরু করেন মহাশক্তির আরাধনা। তাঁর বাসগৃহে পূজিতা নবদুর্গার আরাধনা ধীরে ধীরে গোটা এলাকায় বিস্তার লাভ করে এবং বহুমানুষ এসে উপস্থিত হন এই শারদীয়া পূজাপর্বে।
১৯৩৮ সালে এলাকার জনসাধারনের আগ্রহ এবং আবেদনের কারনে ও জেলিয়াটোলাস্থিত সন্ধানী এ্যাথেলেটিক ক্লাবের সৌজন্যে এই নবরূপী নবদুর্গা প্রতিমা সর্বসাধারনের জন্য সার্বজনীন পূজার রূপ পায়।
দেবী বিবরন
(১) দেবী প্রচন্ডা, (২) দেবী উগ্রচন্ডা, (৩) দেবী চন্ডবতী, (৪) দেবী চন্ডরূপা, (৫) দেবী চন্ডা, (৬) দেবী চন্ডোগ্রা, (৭) দেবী চন্ডনায়িকা, (৮) দেবী চন্ডিকা এবং (৯) দেবী দশভূজাদুর্গা।
প্রত্যেক দেবী দশ অথবা তার থেকে বেশি ভূজা বিশিষ্ট এবং প্রত্যেকের বর্ণ একে অন্যের থেকে আলাদা ও নয়জন দেবী প্রত্যেকেই একজন করে অসুরকে বধ করেছেন। যথাঃ-
- (১) দেবী প্রচন্ডা হলেন কৃষ্ণ বর্ণা এবং ষোড়শ ভূজা বিশিষ্ট। তিনি বধ করেছেন শুম্ভ নামক অসুরকে।
- (২) দেবী উগ্রচন্ডা হলেন রক্ত বর্ণা এবং অষ্টাদশ ভূজা বিশিষ্ট। তিনি বধ করেছেন রক্তবীজ নামক অসুরকে।
- (৩) দেবী চন্ডবতী হলেন ধূম্র বর্ণা এবং ষোড়শ ভূজা বিশিষ্ট। তিনি বধ করেছেন ধুম্রলোচন নামক অসুরকে।
- (৪) দেবী চন্ডরূপা হলেন গৌর বর্ণা এবং ষোড়শ ভূজা বিশিষ্ট। তিনি বধ করেছেন চন্ড নামক অসুরকে।
- (৫) দেবী চন্ডা হলেন নীল বর্ণা এবং ষোড়শ ভূজা বিশিষ্ট। তিনি বধ করেছেন কৈটভ নামক অসুরকে।
- (৬) দেবী চন্ডোগ্রা হলেন তাম্র বর্ণা এবং ষোড়শ ভূজা বিশিষ্ট। তিনি বধ করেছেন নিশুম্ভ নামক অসুরকে।
- (৭) দেবী চন্ডনায়িকা হলেন সুবর্ণ বর্ণা এবং ষোড়শ ভূজা বিশিষ্ট। তিনি বধ করেছেন মধু নামক অসুরকে।
- (৮) দেবী চন্ডিকা হলেন রজত বর্ণা এবং ষোড়শ ভূজা বিশিষ্ট। তিনি বধ করেছেন মুন্ড নামক অসুরকে।
- (৯) দেবী দশভূজাদুর্গা হলেন গৌর বর্ণা এবং নাম থেকেই বোঝা যায় এই দেবী দশ ভূজা বিশিষ্ট। তিনি শূলেবিদ্ধ করে বধ করেছেন অসুরাধীপতি মহিষাসুরকে। এই দেবী সম্পর্কে আরও বেশ কিছু তথ্য হিসাবে বলা যায় এই দেবী সন্ন্যাসিনীবেশা, সাদা রঙের লাল পাড়যুক্ত শাড়ি পরিহিতা, এই দেবীর প্রধান গহনা হিসাবে ব্যবহৃত হয় রুদ্রাক্ষ, ইনি হস্তে, কণ্ঠে ও শিরস্থানে রুদ্রাক্ষ দ্বারা নির্মিত মালা পরেন, এই দেবীর শিরস্থানে কোনরকম মুকুট থাকে না, পরিবর্তে থাকে দেবাদিদেব মহাদেবের ন্যায় কেশপরিহিত চন্দ্র সজ্জিত জটা, এই দেবী দশটি ভূজায় দশ প্রকারের অস্ত্র দেখা যায়, যথাঃ খর্গ, চক্র, গদা, তির, শঙ্খ, ঢাল, বজ্র, ধনুষ, ঘন্টা এবং ত্রিশূল যা দিয়ে তিনি মহিষাসুরকে বধ করেন। দেবীর বাহন হিসাবে আমরা সিংহকে দেখতে পাই।
সমাপন
পুরাতন পরম্পরা বহন করে স্বর্গীয় হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য ও তাঁর পুত্র স্বর্গীয় আশিষ ভট্টাচার্য্য তাঁহাদের জীবনকালে এই পূজার পৌরহিত্য করেছিলেন এবং বর্তমানে হেমচন্দ্রবাবুর পৌত্র শ্রী অঙ্কুর ভট্টাচার্য্য মহাশয় এই নবদুর্গা পূজার পৌরহিত্য করে চলেছেন। এই শারদীয়ার পূর্ণলগ্নে এলাকার ৮ থেকে ৮০ প্রত্যেকেই নিজ ইচ্ছায় এবং পূজার কার্যকলাপহেতু এই পূজাপ্রাঙ্গনে সংবদ্ধ হন। পূর্ণ নিষ্ঠা, রীতিনীতি এবং প্রত্যেকটি নিয়ম মেনে আমাদের সন্ধানী এ্যাথেলেটিক ক্লাব এই পূজাটি দীর্ঘ ৮৭ বৎসর ধরে করে চলেছে। সুগভীর ঐতিহ্যের সাথে এই পূজা শতাব্দী প্রাচীন হওয়ার দোরগোড়াতে এসে উপস্থিত হয়েছে, ক্লাব সদস্য এবং স্বেচ্ছাসেবকদের অসীম প্রচেষ্টায় এবং মা মহামায়ার আশীর্বাদে ভবিষ্যতেও এই পূজা এই একই গৌরব ধারন করে এগিয়ে যাবে।
(তথ্য সংগৃহীত)শুভম ধর২৪ শে শ্রাবণ, ১৪৩২